ভাই দয়া কইরা, আইজকার আমাগো মানববন্ধনের খবরটা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে পৌঁছাইয়েন। উনার মায়ের যখন বাসভবন কাইড়া নিছে, তখন উনার মা দুই চোখের পানি ছাইড়া রাস্তায় নাইমা গেছে। আমরাও আইজ সবকিছু হারাইয়া চোখের পানি ছাইড়া রাস্তায় নামছি। ষড়যন্ত্র করে আমাদের বস্তিতে আগুন লাগাইয়া আমাদের পথের ফকির বানাইয়া দিছে। আমাদের কান্না প্রধানমন্ত্রীর কান পর্যন্ত পৌঁছাইবো না? মানববন্ধনের একফাঁকে প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে এভাবেই কান্না জড়িত কন্ঠে কথাগুলো বলেন বাউনিয়াবাদের পুড়া বস্তির বাসিন্দা নাসরিন বেগম (৩৬)।
রাজধানীর মিরপুরের বাউনিয়াবাঁধ পুকুরপাড় বস্তির বাসিন্দারা পুনর্বাসনের নিশ্চয়তা ছাড়া উচ্ছেদ বন্ধের দাবিতে রবিবার (২১ জুন) বিকাল তিনটায় বাউনিয়াবাদ কালশী রোডে মানববন্ধন করেছেন। মানববন্ধনে অংশ নেওয়া শতাধিক নারী-পুরুষ, শিশু ও প্রবীণ বাসিন্দা অভিযোগ করেন, বছরের পর বছর ধরে তারা এই এলাকায় বসবাস করলেও মৌলিক নাগরিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত। উচ্ছেদের আতঙ্কের পাশাপাশি তাদের জীবন এখন চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে।
মানববন্ধনে অংশগ্রহণকারীরা বলেন, “আমরা খেটে খাওয়া মানুষ, আমরাও এ দেশের নাগরিক। রিকশা চালিয়ে, দিনমজুরি করে, গার্মেন্টসে কাজ করে, বাসাবাড়িতে শ্রম দিয়ে এই শহরকে সচল রাখি। অথচ আমাদের মাথা গোঁজার শেষ আশ্রয়টুকুও কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা চলছে। পুনর্বাসনের ব্যবস্থা না করে উচ্ছেদ করা হলে আমরা কোথায় যাব?
বক্তারা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমানের মানবিক হস্তক্ষেপ কামনা করে বলেন, উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের বিরোধী নন তারা। তবে উন্নয়নের নামে হাজার হাজার দরিদ্র মানুষকে গৃহহীন করা কোনো সভ্য রাষ্ট্রের নীতি হতে পারে না। উচ্ছেদের আগে বিকল্প বাসস্থান ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
মানববন্ধনে বক্তব্য দিতে গিয়ে একাধিক বাসিন্দা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আমরা বাংলাদেশের নাগরিক হয়েও কোনো সুযোগ-সুবিধা পাই না। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নিরাপদ বাসস্থান সব ক্ষেত্রেই আমরা অবহেলিত। অনেক সময় মনে হয়, এই দেশে আমাদের চেয়ে রোহিঙ্গারাই বেশি সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছে। আমরা রাষ্ট্রের কাছে করুণা চাই না, নাগরিক হিসেবে ন্যায্য অধিকার চাই।
ভুক্তভোগী রহিমা বেগম বলেন, ২০ বছরের বেশি সময় ধরে এখানে আছি। স্বামী দিনমজুর। তিন সন্তান নিয়ে কোনোভাবে জীবন চলে। হঠাৎ উচ্ছেদ হলে আমরা রাস্তায় দাঁড়াবো। আমাদের থাকার আর কোনো জায়গা নেই।
মো. হানিফ নামের এক বাসিন্দা বলেন, আমরা অপরাধী নই, আমরা শ্রমজীবী মানুষ। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত পরিশ্রম করে সংসার চালাই। সরকার যদি উন্নয়নের জন্য জায়গা প্রয়োজন মনে করে, করুক। কিন্তু আগে আমাদের পুনর্বাসন করুক। মাথা গোঁজার ঠাঁই ছাড়া উচ্ছেদ করা মানবিক হবে না।
এক নারী শ্রমিক বলেন, ভোরে কাজে বের হই, রাতে ফিরে এই ছোট্ট ঘরে সন্তানদের নিয়ে থাকি। এই ঘরটাই আমাদের সবকিছু। এটা হারালে আমরা নিঃস্ব হয়ে যাব।
মানববন্ধনে বক্তারা আরও অভিযোগ করেন, সম্প্রতি উচ্ছেদ অভিযানের মাত্র কয়েকদিন পরই বাউনিয়াবাঁধের ওই বস্তিতে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এতে বহু পরিবারের ঘরবাড়ি, আসবাবপত্র ও নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র পুড়ে যায়। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর অনেকেই এখনও স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেননি।
স্থানীয়দের দাবি, উচ্ছেদের চার দিনের মাথায় সংঘটিত ওই অগ্নিকাণ্ড তাদের মধ্যে নতুন করে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। আগুন লাগার কারণ নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠলেও প্রকৃত কারণ উদঘাটনে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানান তারা। অনেক বাসিন্দা অভিযোগ করেন, আগুনের ঘটনায় তারা সর্বস্ব হারিয়েছেন, কিন্তু পর্যাপ্ত সহায়তা পাননি।
মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, একদিকে উচ্ছেদের ভয়, অন্যদিকে আগুনে ঘরবাড়ি হারানোর কষ্ট দুই সংকটের মধ্যে আমরা মানবেতর জীবনযাপন করছি। আমাদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। অনেক শিশুর পড়াশোনা বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে।
তারা আরও বলেন, দেশের উন্নয়ন তখনই অর্থবহ হবে, যখন সেই উন্নয়নের সুফল সমাজের দরিদ্র ও প্রান্তিক মানুষের কাছেও পৌঁছাবে। রাষ্ট্রের দায়িত্ব নাগরিকদের নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করা। তাই পুনর্বাসন ছাড়া কোনো উচ্ছেদ কার্যক্রম পরিচালনা না করার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি জোর দাবি জানান তারা।
মানববন্ধন থেকে সরকারের কাছে কয়েকটি দাবি উত্থাপন করা হয়। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে উচ্ছেদ কার্যক্রম স্থগিত করা, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর তালিকা প্রণয়ন, পুনর্বাসনের জন্য বিকল্প আবাসনের ব্যবস্থা, অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত এবং নিম্নআয়ের মানুষের জন্য দীর্ঘমেয়াদি আবাসন নীতি প্রণয়ন।
শেষে বস্তিবাসীরা বলেন, আমরা সংঘাত চাই না, ন্যায়বিচার চাই। আমরা অবৈধ কিছু চাই না, শুধু বেঁচে থাকার অধিকার চাই। পুনর্বাসন ছাড়া উচ্ছেদ নয় এটাই আমাদের একমাত্র দাবি।
Leave a Reply