বাংলাদেশের সাংবাদিক সমাজের অন্যতম আলোচিত হত্যাকাণ্ড সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনি হত্যাকাণ্ড আজও রহস্যের জালে আবদ্ধ। প্রায় তেরো বছর পার হলেও হত্যার সঠিক কারণ এবং দোষীদের শনাক্ত করতে পারেনি তদন্তকারী সংস্থাগুলো। বারবার তদন্তের মেয়াদ বাড়ানো, একের পর এক প্রতিশ্রুতি, আর নানামুখী বক্তব্য তদন্তের স্বচ্ছতা নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলেছে।
হত্যাকাণ্ডের পটভূমি:
২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি ভোররাতে ঢাকার পশ্চিম রাজাবাজারের নিজ বাসায় নির্মমভাবে খুন হন এটিএন বাংলার বার্তা সম্পাদক সাগর সরওয়ার ও মাছরাঙা টেলিভিশনের জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক মেহেরুন রুনি। এই ঘটনায় গোটা দেশজুড়ে চাঞ্চল্য ছড়িয়ে পড়ে। প্রথমে মামলার তদন্তে দায়িত্ব দেওয়া হয় শেরেবাংলা নগর থানা পুলিশকে, পরে দায়িত্ব দেওয়া হয় গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) এবং পরবর্তীতে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) তদন্তের দায়িত্ব গ্রহণ করে।
প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবতা:
ঘটনার পরপরই তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন ঘোষণা দিয়েছিলেন, “৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই খুনিদের গ্রেপ্তার করা হবে।” কিন্তু সেই ৪৮ ঘণ্টা পেরিয়ে গেছে অনেক আগেই, আর এর মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার সময়ও বাড়ানো হয়েছে অন্তত ১০০ বারেরও বেশি। এতদিন পরেও মূল হত্যাকারী বা হত্যার মোটিভ বিষয়ে কোনো নির্ভরযোগ্য প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়নি। মাঝে মধ্যে কিছু সন্দেহভাজনকে গ্রেপ্তার করা হলেও, শক্ত প্রমাণের অভাবে তাদের মুক্তি দিতে হয়েছে।
নানামুখী বক্তব্যে বিভ্রান্তি:
তদন্তের বিভিন্ন পর্যায়ে একেক সংস্থা একেক ধরনের ব্যাখ্যা দিয়েছে। র্যাব জানিয়েছিল, হত্যাকাণ্ডে “পেশাদার খুনি” জড়িত থাকতে পারে, আবার কখনও বলা হয়েছে “ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব” থেকেই হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। এছাড়া, নিহতদের পারিবারিক ও পেশাগত জীবনের নানা দিক নিয়েও তদন্ত হয়েছে, তবে কোনোটিরই নিশ্চিত ফলাফল প্রকাশ করা হয়নি। ফলে প্রত্যাশিত বিচার না হওয়ায় হতাশায় ভুগছে নিহত সাংবাদিক দম্পতির পরিবার এবং দেশের সংবাদকর্মী সমাজ।
সাংবাদিক মহলের প্রতিক্রিয়া:
সাগর-রুনি হত্যার বিচার চেয়ে বারবার প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করেছে বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন (বিএফইউজে), ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি (ডিআরইউ) সহ বিভিন্ন সংগঠন। প্রতিবারই তারা তদন্তে গতি আনার আহ্বান জানিয়েছে। সাংবাদিক নেতারা বলেন, “সাগর-রুনি হত্যার বিচারহীনতা সাংবাদিকদের নিরাপত্তাকে আরও সংকটে ফেলেছে।”
বর্তমান অবস্থা:
২০২৫ সালের আজ পর্যন্ত র্যাব বলছে, “তদন্ত চলছে,” তবে কবে নাগাদ তদন্ত শেষ হবে এবং আদৌ কোনো বিচার হবে কিনা — সে বিষয়ে পরিষ্কার কোনো উত্তর পাওয়া যাচ্ছে না। এদিকে এই হত্যাকাণ্ড নিয়ে পরিবারের সদস্যরাও আশা হারাতে বসেছেন। তাদের দাবি, সরকার ও তদন্ত সংস্থার সদিচ্ছা থাকলে এই হত্যার রহস্য অনেক আগেই উদঘাটিত হতো।
Leave a Reply