ময়মনসিংহের গৌরীপুর উপজেলায় গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য বরাদ্দকৃত টিআর, কাবিখা ও কাবিটা প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রকল্পের কাজ বাস্তবায়ন না করেই বিল উত্তোলন, নামমাত্র কাজ করে পুরো বরাদ্দের অর্থ তুলে নেওয়া এবং পুরোনো কাজকে নতুন প্রকল্প হিসেবে দেখিয়ে অর্থ উত্তোলনের অভিযোগ রয়েছে।
এসব অনিয়মের নেপথ্যে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) মোহাম্মদ আলাল উদ্দিনের বিরুদ্ধে ভুয়া নথিপত্র ও কাগজপত্রের মাধ্যমে প্রকল্পের অর্থ ছাড়ে সহযোগিতার অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয়রা। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে গৌরীপুর উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে টিআর, কাবিখা ও কাবিটা প্রকল্পের নামে বরাদ্দ দেওয়া হলেও বাস্তবে অনেক প্রকল্পের কাজই হয়নি। আবার কিছু প্রকল্পে আংশিক কাজ করেই পুরো বরাদ্দের টাকা উত্তোলন করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগের বাস্তবতা যাচাই করতে গত ৬, ৭ ও ৮ আগস্ট উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন ও গ্রামে সরেজমিনে পরিদর্শন করা হয়। স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে এবং প্রকল্পস্থল ঘুরে কয়েকটি প্রকল্পে কাজ না হওয়া কিংবা নামমাত্র কাজ হওয়ার অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে বলে দাবি করা হয়েছে।
প্রকল্প বাস্তবায়ন কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, গত ৩০ জুন নির্ধারিত সময়ের আগেই এসব প্রকল্পের বরাদ্দের অর্থ উত্তোলন করা হয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, রায়গঞ্জ বাজার থেকে কান্দির ঘাট বাজার সড়ক সংস্কারের জন্য ১ লাখ ১৩ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। একই পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয় নন্দীগ্রাম শামছুলের বাড়ি থেকে রফিকের চায়ের দোকান পর্যন্ত রাস্তার জন্য।
এছাড়া কলতাপাড়া থেকে গৌরীপুর সড়ক হয়ে দক্ষিণ দিকে বড়ইতলা রাস্তার আংশিক সলিং ও সংস্কার এবং সাহেব কাচারী সীমান্ত থেকে কাঠবাড়ীর সালামের বাড়ি পর্যন্ত রাস্তা সংস্কারের প্রকল্পও অনুমোদন দেওয়া হয়।
স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল করিমসহ কয়েকজনের দাবি, এসব প্রকল্পের অধিকাংশ স্থানে বাস্তবে দৃশ্যমান কোনো কাজ হয়নি।
অন্যদিকে, ময়লাকান্দা ইউনিয়নের গোবিন্দপুর বাজার এইচবিবি রাস্তা থেকে টিকুরীগামী সড়কে গাইডওয়াল নির্মাণ ও সংস্কারের জন্য ৮ লাখ ৬৭ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। ভেংগা পূর্বপাড়া পাকা রাস্তা থেকে মাদ্রাসা পর্যন্ত এইচবিবিকরণের জন্য বরাদ্দ রয়েছে ১০ লাখ টাকা।
এছাড়া শ্যামগঞ্জ-গৌরীপুর সড়কের গাভীশিমুলা থেকে পূর্ব ভালুকা প্রাথমিক বিদ্যালয় হয়ে খোদাবক্সের বাড়ি পর্যন্ত রাস্তার জন্য ৩ লাখ টাকা, অচিন্তপুর ডেকুরা বাজার সড়কে সিসিকরণের জন্য ৩ লাখ টাকা এবং মাওহা ভাটিয়ারকোনা লালচানের বাড়ি থেকে আহম্মদপুর কামাল মেম্বারের বাড়ি পর্যন্ত রাস্তার জন্য ৪ লাখ ৪০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, মাওহা এলাকার ওই প্রকল্পে আনুমানিক ৩০ শতাংশ কাজ করেই পুরো বরাদ্দের অর্থ উত্তোলন করা হয়েছে।
এদিকে, গৌরীপুরে এর আগেও টিআর, কাবিখা ও কাবিটা প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছিল। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিভিন্ন প্রকল্পে অনিয়মের পাশাপাশি সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পে প্রায় ৪ কোটি টাকা দুর্নীতির অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনে অভিযোগ দেওয়া হলে সংস্থাটির অভিযান পরিচালনার কথাও জানা যায়। তবে ওই অভিযানের তদন্তের অগ্রগতি বা প্রতিবেদন এখনো প্রকাশ্যে না আসায় প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা।
স্থানীয় বাসিন্দা আজিজুল হকের অভিযোগ, আগের অভিযোগগুলোর যথাযথ তদন্ত ও ব্যবস্থা না হওয়ায় নতুন করে অনিয়মের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা মো. হায়াত আলী, আবু বকর, লোকমান হোসেন, বিল্লালসহ অনেকে বলেন, সরকারি বরাদ্দের অর্থে প্রকল্প বাস্তবায়নের কথা থাকলেও বাস্তবে অনেক স্থানে কাজের কোনো চিহ্ন নেই। তারা প্রকল্পগুলোর বরাদ্দ, প্রকল্প কমিটি, বিল-ভাউচার এবং বাস্তবায়ন সংক্রান্ত নথিপত্র যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।
অভিযোগের বিষয়ে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) মোহাম্মদ আলাল উদ্দিনের বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থ যথাযথভাবে ব্যয় হয়েছে কি না, প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির মাধ্যমে কাজ হয়েছে কি না এবং বিল উত্তোলনের ক্ষেত্রে কোনো অনিয়ম হয়েছে কি না—তা খতিয়ে দেখতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
স্থানীয়দের দাবি, প্রকল্পভিত্তিক তদন্ত করে অনিয়মের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হোক এবং সরকারি অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা হোক।
Leave a Reply