রাজধানীর পল্লবী থানাধীন বাউনিয়াবাদ এলাকায় গর্ভবতী নারী ফারজানাকে অপহরণ ও নির্মম নির্যাতনের পর হত্যার ঘটনায় আলোচিত ও বিতর্কিত বিএনপি নেতা এবং পল্লবীর শীর্ষ সন্ত্রাসী আসলাম গাজীকে গ্রেপ্তার করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
ফারজানার পরিবারের দায়ের করা হত্যা মামলার ভিত্তিতে তাকে আটক করা হয়। নিহত ফারজানার পরিবার দাবি করেছে, পরিকল্পিতভাবে সাভার থেকে তাকে অপহরণ করে এনে বাউনিয়াবাদ এলাকায় একটি বাসায় দু’দিন আটকে রেখে পাশবিক নির্যাতনের মাধ্যমে হত্যা করা হয়। অপহরণ ও নির্যাতনের মূলহোতা হিসেবে তারা আসলাম গাজীর নাম উল্লেখ করেছে।
আসলাম গাজী পল্লবী থানা বিএনপির ৫ নম্বর ওয়ার্ডের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক পদে দায়িত্বপ্রাপ্ত হওয়ার পর থেকেই এলাকায় তার দাপট ও অপরাধ কর্মকাণ্ড বাড়তে থাকে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির আহ্বায়ক আমিনুল হকের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত হওয়ায় তার বিরুদ্ধে দলীয়ভাবে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এমনকি হত্যা মামলায় আসামি হওয়ার পরও দলীয় পদ থেকে তাকে বহিষ্কার বা সাময়িক বরখাস্ত করা হয়নি।
স্থানীয়রা অভিযোগ করেন, মূল সাধারণ সম্পাদককে কৌশলে সরিয়ে দিয়ে আসলামের মতো একজন সন্ত্রাসীকে দায়িত্বে বসানো হয়েছিল রাজনৈতিক ছত্রছায়া বজায় রাখার অংশ হিসেবেই।
ভুক্তভোগী পরিবারের ভাষ্যমতে, আসলামের নির্দেশে তার সহযোগীরা সাভার থেকে গর্ভবতী ফারজানাকে অপহরণ করে পল্লবীর বাউনিয়াবাদে নিয়ে আসে। সেখানে দুই দিন আটকে রেখে তাকে বর্বর নির্যাতন করা হয়। অবশেষে তার মৃত্যু হলে মরদেহ গোপন করে রাখা হয়। ঘটনার দুই দিন পর মরদেহ উদ্ধার হলে এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্য ছড়িয়ে পড়ে।
আসলাম গাজী দীর্ঘদিন ধরে পল্লবী, মিরপুর ও আশপাশের এলাকায় চিহ্নিত অপরাধী হিসেবে পরিচিত। তার বিরুদ্ধে রয়েছে: জমি ও ফ্ল্যাট দখল, চাঁদাবাজি, অস্ত্র ও মাদক ব্যবসা, সন্ত্রাসী কার্যক্রম।
বিশেষত পল্লবীর আলোচিত রফিক হত্যা মামলার নেপথ্যে তার নাম শোনা গেলেও, ‘অদৃশ্য শক্তির’ ছায়ায় থেকে সে এড়িয়ে যায় আইনের হাত।
নব্বই দশকের শেষভাগে স্থানীয় মাস্তান হিসেবে যাত্রা শুরু করা আসলাম গাজী দ্রুত সংগঠিত করে একটি ভয়ংকর সন্ত্রাসী গ্রুপ। শুরুতে চাঁদাবাজি ও জমি দখলের মধ্য দিয়ে তার পথচলা হলেও বর্তমানে সে মালিক একাধিক বাণিজ্যিক ভবনের, যার বেশিরভাগই অবৈধ দখলের মাধ্যমে অর্জিত।
সূত্র মতে, মিরপুরের বিভিন্ন এলাকায় কেউ যদি জমি বা ফ্ল্যাট বিক্রি করতে চায়, তাহলে তাকে আসলামের দালালদের মাধ্যমে বিক্রি করতে বাধ্য করা হয়। অনেকে চাঁদা না দিলে সন্ত্রাসী হামলারও শিকার হন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রশাসনের কিছু অসাধু কর্মকর্তা ও রাজনৈতিক দলের একাংশের পৃষ্ঠপোষকতায় আসলাম গাজী দিনদিন আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। তার বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ ও মামলার পরেও দীর্ঘদিন তাকে আইনের আওতায় আনা সম্ভব হয়নি।
ফারজানার মতো এক গর্ভবতী নারীর নির্মম মৃত্যু কেবল একটি হত্যাকাণ্ড নয়, বরং এটি রাজধানীর রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক অন্ধকার জগতের নগ্ন চিত্র প্রকাশ করে। আসলাম গাজীর গ্রেপ্তারকে কেন্দ্র করে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে এই দানবকে পুষ্ট করেছে কারা, এবং কেন দীর্ঘদিন সে ধরা-ছোঁয়ার বাইরে ছিল?
ফারজানার পরিবার ও এলাকাবাসীর দাবি, শুধু আসলামের গ্রেপ্তার নয়, তার গড়ে তোলা পুরো অপরাধ সাম্রাজ্যকে ভেঙে দিয়ে বিচার নিশ্চিত করতে হবে, নয়তো এমন ঘটনা বারবার ঘটবে শিকার হবে নিরীহ সাধারণ মানুষ।
উল্লেখ্য: বৃহস্পতিবার (৫ জুন) হত্যা মামলা করেন ভুক্তভোগীর ভাই মো. রকি। মামলায় আসলাম ছাড়াও ১৩ জন নামীয় ও ১২ জন অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে।
ভুক্তভোগীর পরিবারের অভিযোগ, আসলামের নির্দেশেই সাভার থেকে গর্ভবতী ও এক সন্তানের জননী ফরজানাকে অপহরণ করে এনে পল্লবীর বাউনিয়াবাদ এলাকার একটি বাসায় আটকে রাখা হয়। সেখানেই দুই দিন ধরে চলতে থাকে পাশবিক নির্যাতন। যার পরিণতিতে ফরজানার মৃত্যু হয়।
Leave a Reply