বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে আবারও নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে ৮১ হাজার কোটি টাকার খেলাপি ঋণ অবলোপনের ঘটনায়। অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এ ধরনের সিদ্ধান্ত দোষীদের আড়াল করার এক প্রকার প্রাতিষ্ঠানিক প্রচেষ্টা, যা দেশের আর্থিক খাতকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলতে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন ব্যাংক ৮১ হাজার কোটি টাকারও বেশি খেলাপি ঋণ ‘ওয়াইট-অফ’ বা অবলোপন করেছে। এর মানে হচ্ছে, এই ঋণগুলিকে ব্যাংকের ব্যালান্স শিট থেকে সরিয়ে ফেলা হয়েছে, যেন এগুলো আর আনুষ্ঠানিকভাবে খেলাপি হিসেবে তালিকাভুক্ত না থাকে। তবে বাস্তবে এসব ঋণের বড় অংশই আদায় হয়নি, এবং আদায়ের সম্ভাবনাও ক্ষীণ।
বিশ্লেষকদের মতে, অবলোপন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রকৃত খেলাপিদের আইনি বা নীতিগত জবাবদিহির আওতা এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। এতে শুধু ব্যাংকগুলোর আর্থিক অবস্থাই দুর্বল হয় না, বরং সাধারণ আমানতকারীদের সঞ্চয়ও ঝুঁকির মুখে পড়ে।
এ প্রসঙ্গে অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, “ঋণ অবলোপন ব্যবস্থার মূল উদ্দেশ্য ছিল আর্থিক প্রতিবেদনের স্বচ্ছতা আনা, কিন্তু বাস্তবে এটি খেলাপি সংস্কৃতি উৎসাহিত করছে। দোষীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের পরিবর্তে তাদের দায়মুক্তি দেওয়া হচ্ছে।”
ব্যাংকিং খাতের অভ্যন্তরীণ সূত্র জানায়, যেসব বড় ব্যবসায়ী ও প্রভাবশালী গ্রুপ বছরের পর বছর ঋণ ফেরত না দিয়ে পার পেয়ে গেছে, তারাই মূলত এই সুবিধা পাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে, যারা ঋণ অবলোপনের সুবিধা নিয়েছে, তারা একই সঙ্গে নতুন করে ঋণও পাচ্ছে।
সরকারি পর্যায়ে কিছু কর্মকর্তা দাবি করেছেন, এটি একটি “অডিট-সমন্বয় প্রক্রিয়া” মাত্র। কিন্তু আর্থিক বিশ্লেষক ও সাধারণ নাগরিকরা বিষয়টিকে দায়মুক্তির “নতুন মোড়ক” হিসেবে দেখছেন।
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে আরও জানা গেছে, অবলোপনকৃত ঋণগুলোর বিরুদ্ধে মামলা জারি থাকলেও, অধিকাংশ ক্ষেত্রে আদায় কার্যক্রম কার্যকরভাবে পরিচালিত হচ্ছে না। এর ফলে ব্যাংকগুলোর সম্পদমান নষ্ট হচ্ছে এবং দেশের আর্থিক ব্যবস্থার ওপর চাপ বাড়ছে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা এখনই শক্ত হাতে ঋণ আদায়ের উদ্যোগ নেওয়া এবং দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা জোরদারের আহ্বান জানিয়েছেন, যাতে ব্যাংকিং খাতের প্রতি মানুষের আস্থা পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হয়।
Leave a Reply