রাজধানীর পল্লবী এলাকায় হত্যা মামলার আসামি এবং দল থেকে বহিষ্কৃত দুই নেতা ইব্রাহিম খলিল ও রিয়াজকে ঘিরে নতুন করে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। দলীয় পদ হারানোর পরও এলাকায় তাদের প্রভাব-প্রতিপত্তি আগের মতোই বহাল রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, বহিষ্কারের পরও বিভিন্ন স্থানে তাদের ছবি সম্বলিত ব্যানার, পোস্টার ও অনুসারীদের তৎপরতা দৃশ্যমান থাকায় প্রশ্ন উঠেছে দলীয় সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হচ্ছে, নাকি কেবল কাগজ-কলমেই সীমাবদ্ধ?
দলীয় সূত্রে জানা যায়, অভিযোগ ও বিতর্কের প্রেক্ষাপটে ইব্রাহিম খলিল ও রিয়াজকে সাংগঠনিক পদ থেকে বহিষ্কার করা হয়। একইসঙ্গে দল আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা দেয়, বহিষ্কৃত কোনো ব্যক্তির দায়-দায়িত্ব দল বহন করবে না। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানানো হয় এবং নেতাকর্মীদের তাদের সঙ্গে কোনো সাংগঠনিক সম্পর্ক না রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বহিষ্কারের পরও কোন এক অদৃশ্য শক্তিতে এলাকায় ইব্রাহিম ও রিয়াজের অনুসারী কাইল্লা মোতালেব, আশিক, জলিল, সবুজ, মানিক, মামুন, শাহাদাত (১), শাহাদাত (২), রতন, হোসেন, মোল্লা জুয়েল, ইসলাম, ইমরান, জাকির ও লালনসহ অপরাধীরা এলাকায় সক্রিয় রয়েছে বিভিন্ন স্থানে তাদের ছবি সম্বলিত ব্যানার-ফেস্টুন ঝুলতে দেখা যায়। ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে দলের সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়েছে, নাকি প্রভাবশালী মহলের ছত্রচ্ছায়ায় বহিষ্কৃত নেতারা এখনো এলাকায় আধিপত্য বজায় রেখেছেন?
অনুসন্ধানে স্থানীয় একাধিক সূত্র দাবি করেছে, ইব্রাহিম খলিল ও রিয়াজ দীর্ঘদিন ধরে বিদেশে পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসীদের হয়ে এলাকায় প্রভাব বিস্তার করতেন। তাদের মাধ্যমে এলাকায় নানা অপরাধ মূলক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হতো।
The Crime Search এর অনুসন্ধ্যানে আরও জানা যায়, ওয়াপদা বিল্ডিং ক্যাম্পের শাড়ী ব্যবসায়ী পারভেজ নামের এক ব্যক্তি ও তার আত্মীয় স্বজনদের বাড়িঘর, দোকানপাট দখল ও লুটপাট করেছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন উঠেছে হত্যা মামলার তদন্ত ও আসামিদের গ্রেপ্তার নিয়ে। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, হত্যা মামলার এক নম্বর ও তিন নম্বর আসামি হওয়ার পরও ইব্রাহিম খলিল, রিয়াজ ও তাদের অনুসারীদের প্রকাশ্যে চলাফেরা করতে দেখা গেছে। অথচ পুলিশ বলছে, আসামিরা এলাকায় নেই এবং তাদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।
স্থানীয়দের প্রশ্ন, যদি আসামিরা এলাকায় না-ই থাকে, তাহলে বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচি ও জনসমাগমে তাদের উপস্থিতির অভিযোগ বারবার উঠছে কেন?
অভিযোগ রয়েছে, সম্প্রতি পল্লবীতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আগমন উপলক্ষে আয়োজিত কর্মসূচিতে দল থেকে বহিষ্কৃত এবং হত্যা মামলার আসামিদের প্রকাশ্যে মিছিল করতে দেখা গেছে। এ ঘটনার ছবি ও ভিডিও স্থানীয়দের মধ্যে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখের সামনে যদি মামলার আসামিরা রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ নিতে পারে, তাহলে তাদের গ্রেপ্তার করা সম্ভব হচ্ছে না কেন?
এদিকে ভুক্তভোগী পরিবার ও স্থানীয়দের অভিযোগ, মামলার শুরু থেকেই পুলিশ নানা অজুহাতে গড়িমসি করেছে। এমনকি অভিযুক্তদের নাম বাদ দেওয়ার চাপ এবং মামলা গ্রহণে অনীহার অভিযোগও উঠেছে। পরে বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশ এবং জনমতের চাপের মুখে মামলা নেওয়া হলেও এখন পর্যন্ত প্রধান আসামিদের গ্রেপ্তারে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না।
পল্লবী থানা পুলিশের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। তবে এ বক্তব্যে সন্তুষ্ট নন স্থানীয়রা। তাদের মতে, দীর্ঘ সময় পার হলেও আসামিরা ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকায় পুলিশের আন্তরিকতা নিয়েই প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
সচেতন মহলের মতে, কোনো ব্যক্তি রাজনৈতিক পরিচয় হারালেও যদি তার বিরুদ্ধে গুরুতর অপরাধের অভিযোগ ও মামলা থাকে, তাহলে তাকে দ্রুত আইনের আওতায় আনা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। অন্যথায় বিচারহীনতার সংস্কৃতি আরও শক্তিশালী হবে এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে আইনের শাসনের প্রতি অনাস্থা তৈরি হবে।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, দলীয় পরিচয়, রাজনৈতিক প্রভাব কিংবা ক্ষমতার ছত্রচ্ছায়া নয় আইনের চোখে সবাই সমান। তাই হত্যা মামলার আসামিদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনার পাশাপাশি মামলার সুষ্ঠু তদন্ত নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।
এখন এলাকাবাসীর একটাই প্রশ্ন? দল যখন তাদের বহিষ্কার করেছে, তখন আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কবে তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেবে?
Leave a Reply