১৯৯৬ সালে ছিলেন গুলশান তিতাসের সুপারভাইজার। তখন থাকতেন ভাড়া বাড়িতে। এরপর হন ইন্সপেক্টর, বদলে যায় ভাগ্যের চাকা। তিতাসের কন্ট্রাক্টরদের কাছ থেকে ফাইল প্রতি নির্দিষ্ট ছিলো ৬ হাজার টাকা। গুলশানের বস্তিগুলো থেকে অবৈধ সংযোগে মিলতো টাকা। সেখান থেকে মিরপুর ১২ নম্বর চৌরঙ্গী সেখান থেকে ১০ নম্বর পানির ট্যাঙ্কি। সেখান থেকে সেনপাড়া। এসব এলাকার বস্তি ঘরে জ্বালানি গ্যাসের সব অবৈধ সংযোগের নেপথ্য নায়ক গ্যাস বিপণনের দায়িত্বে থাকা তিতাসের সাবেক কর্মকর্তা শেখ মো: আমান উল্লাহ। তবে দীর্ঘদিনে সহযোগি মানুষটি বলেন সম্পর্ক এখনো ভালো। কাইন্ডলি আমার নামটা বলবেন না।
শুধুই কি বস্তি, আবাসিক এলাকার হোটেল রেস্তোরা থেকে শুরু করে সবখানেই এই মানুষটির যাদুর ছোঁয়ায় গ্যাস পৌঁছে গেছে অবাধে। অভিযোগ আছে খোদ সরকার যেখানে মাসে মাসে বিল না পেতো সেখানে এই ইন্সপেক্টরের কাছে ৫ তারিখের আগেই পৌঁছে যেতো অবৈধ গ্যাস সংযোগের বিল। এদিক ওদিক হলেই কাটা যেতো লাইন আবারো দিতে হতো নতুন সংযোগ ব্যয়। এভাবেই শেখ আমান উল্লাহ পরিচিতি পায় ‘গ্যাস শেখ’ নামে। আর নামের আগে শেখ থাকার পুরো সুবিধা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে।
গুলশানের সাবেক এক তিতাস কন্ট্রাক্টার জানান, হেরে আমি চিনি তার শুরু থেককাই। আগে থাকতো ভাড়া বাড়িতে এখন অনেক জায়গা সম্পত্তি করসে। তয় টেকা হওয়ার পর হের একটু আলুর দোষ দেখা দিসে। এখন সবখানে মুখ দেয়। বলেন টাকার কুমির বনে যাওয়ার পাশাপাশি জেঁকে বসে নারী আসক্তি। তবে কোন সাধারন নারী নয় তার পছন্দ ভার্জিন বা কুমারি নারী। কেউ কুমারী নারী সরবরাহ করলে তিতাসের যে কোন ফাইন নিমিষে পাশ করানোর দায়িত্ব তার। তাকে প্রশ্ন করা হয়েছিলো আপনি কখনো মেয়ে সাপ্লাই করসেন? ভারজিন? একটু ইতস্ত করে বলেন, “না আমি সরাসরি না দালাল দিয়ে পাডাইসি। হেয় তো এহানে কিছু করে না। গাজীপুর পার হয়ে ডানে গিয়ে সখিপুরে একটা রিসোর্ট আসে। হেইহানে যায়।
অনুসন্ধানে জানা গেলো তালিকায় আছে মডেল থেকে বাড়ির দারোয়ানের স্ত্রীও। অভিযোগ বলছে, এই অনৈতিক বিষয় প্রকাশ পাওয়ায় তার বাড়িতে হামলাও চালায় স্থানীয়রা। আর সেই অনৈতিক সম্পর্কের ধারাবাহিকতায় ঘরও ভেঙ্গেছে একাধিক দারোয়ানের। এনিয়ে মামলার আসামী হওয়ার পর সেগুলো আবার মিটিয়েও ফেলেছেন টাকার বিনিময়ে, জানালেন আমান উল্লারই এক বিশস্ত প্রতিবেশি।
ভুক্তভোগি এক দারোয়ান জানান, “বাপের মতো মানতাম স্যাররে। হেয় আমার বউডারে নষ্ট করলো। কার কাছে বিচার চামু। আমার বউডার লগে হেসমেস ছাড়াছাড়ি হইয়া গেছে। রুপনগর আরামবাগ হাউজিং এর স্থানীয়রা জানান, “এই লোকের কারনে পরিবেশ একেবারে নোংরা হয়ে গেছে। দুই দিন পর পর একেকটা কেলেঙ্কারীতে তার নিজের পরিবারও বিরক্ত। বড় মেয়ে জামাই এসবে বাধা দেয়ায় সে এখন এক নম্বর শত্রু।
আরেকজন বলেন,“তার ঘেটু এক শিল্পপতি মালিকের ভাগিনা মোঃ শরিফুল ইসলাম, ডাক নাম বিজয়। আমান উল্লাহ’র চার নাম্বার মেয়ের জামাই, ঘর জামাই থাকায়, সে এলাকায় ঘর জামাই বিজয় হিসেবে পরিচিত। অনৈতিক কর্মকান্ডের জন্য শশুর আমান উল্লাহ’র উপর কোন বিপদে পরলেই সেই মামার দাপট দেখায়।
অনুসন্ধানে জানা যায় বিজয়ের মামা একটি গ্রুপের চেয়ারম্যান পদধারী কাগুজে কোম্পানী খুলে বিগত সরকারের প্রভাবশালীদের যোগসাজশে বারোটা বাজিয়েছিলো দেশের ব্যাংকিং খাতের। পিকে হালদারের ঘনিষ্ঠ এই মানুষটি নাকি আড়ালে থেকে সার্পোট দিচ্ছে ভাগনে পরিচয় দেয়া বিজয় ও আর তার শ্বশুড়কে।
এই প্রতিবেদক অভিযোগের সত্যতার বিষয় জানতে যোগাযোগ করেন আমান উল্লাহ’র সাথে। এরপর খানিক বাদেই সাংবাদিক পরিচয়ে মুঠোফোনে ফোন দেন এক ব্যক্তি। ট্রু কলারে লিখা ওঠে একটি গ্রুপের অন্যতম কর্তা তিনি। তার সব অভিযোগের অডিও-ভিডিও রেকর্ডিং মিলে প্রাথমিক অনুসন্ধানে। অভিযোগ বলছে কয়েকশত কোটি টাকার মালিক তিতাসের এই কর্মকর্তা। তার এই সম্পদ অর্জনের নেপথ্যে মিলেছে নানা অবৈধ উৎসের তথ্য।
১. অবৈধ গ্যাস সংযোগ প্রদান।
২. বস্তিতে অবৈধ সংযোগ দেয়া বাবদ টাকা আদায়।
৩. অবৈধ সংযোগ থেকে বিল আদায়।
৪. বৈধ সংযোগে অনৈতিক আর্থিক লেনদেন।
৫. নারীর বিনময়ে কাজ করা।
৬. নামে বেনামে অবৈধ সম্পদ অর্জন।
৭. ট্যাক্স ফাইলে কারসাজি।
ঘুষ-দুর্নীতির মাধ্যমে বিপুল অর্থ সম্পদের মালিক বনে যাওয়া তিতাসের সাবেক এই কর্মকর্তা রাজধানীর মিরপুরে গড়ে তুলেছেন আবাসিক এবং বাণিজ্যিক একাধিক ভবন। রয়েছে একাধিক প্লট ও ফ্ল্যাটও। মিরপুরের রূপনগর আরামবাগ হাউজিং এলাকায় সেকশন-৭, ব্লক-ই এর মেইন রোডে ১টি ৬ তলা ভবন এটাতেই স্বপরিবারে বসতি তার। একই রোডে আরও একটি জোড়া ৫ কাঠা নতুন প্লটের সন্ধান পাওয়া গেছে যার মালিক পরিচয় দেন শেখ মোঃ আমানুল্লাহ ও তার মেয়ের জামাই মোঃ শরিফুল ইসলাম বিজয়। সরজমিনে গিয়ে দেখা যায় ভবন নির্মাণের কাজ চলছে সেটিতে। কোথা থেকে আসলো এ অর্থ?
রূপনগর রেসিডেন্সিয়াল এরিয়ায় ২০ নাম্বার রোডে ২৬ নম্বর ও ৭১ নম্বর প্লটে ২টি ৭ তলা ভবন এবং ৪ নাম্বার রোডে ২২টি রুমের টিন শেডের আড়াই কাঠা ও তার বিয়াই জাফরের মালিকানায় আড়াই কাঠা টিন শেড দেখানো হলেও পুরো ৫ কাঠা বাড়িটি শেখ মোঃ আমানুল্লাহ’র নিয়ন্ত্রণে বলছে তারই লোকেরা। রূপনগর রেসিডেন্সিয়াল এরিয়ার ২২ নাম্বার রোডের ৪২ নাম্বার বাড়ির ৭ তলার ভবনে ও মিরপুর সাড়ে ১১-তে কে/৩ এক্সটেনশন পল্লবী দুয়ারি পাড়ায়ও রয়েছে তার একাধিক ফ্ল্যাট। মালিকানা কার এমন প্রশ্নে উত্তরে স্থানীযরা উচ্চারণ করেন আহসান উল্লাহর-ই নাম। তবে অবৈধ অর্থবিত্তের মালিক হলেও, ভুলে যাননি পরিবারের সদস্যদের। দুয়ারি পাড়ার ফ্ল্যাটগুলোতে পরিবার নিয়ে তার ভাইয়েরাই বসবাস করছে। অনুসন্ধানে রূপনগর শপিং কমপ্লেক্স মার্কেটে ১০টি দোকান ও মার্কেট ভবনে তার পরিবারের সদস্যদের নামে ৬ টি ফ্ল্যাটের তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে কয়েকটি ফ্ল্যাট ক্রয়-বিক্রয় করা হয়েছে বলেও জানা যায়।
দোকান আছে বাংলা বহুমুখী সমবায় সমিতি লিমিটেড মার্কেটেও জানান আমানু উল্লাহর-ই ঘনিষ্ট জন। তবে নারাজ নাম প্রকাশে।
এছাড়াও তার ট্যাক্স ফাইল ও তার বাইরের সম্পদের তালিকায় আছে ঢাকার শেওড়াপাড়া জামতলা মাঠ কবরস্থান সংলগ্ন একটি ৩ কাঠার প্লট (এটির দখল এখনও বুঝে পাননি ঝামেলার কারনে), সেনপাড়া পারবতা ৭ নং ওয়ার্ডে ৪.১২ শতাংশ জমি ও সেনপাড়া পরবতায় আরও ৫.১৬ শতাংশ জমি রয়েছে। বিশাল সম্পদ গড়ে তুলেছেন নোয়াখালীর বেগমগঞ্জের মীরওয়ারিশপুরে। সেখানে আছে রাজকীয় এক দোতলা ভবন। বেনামে প্লট কিনেছেন পূর্বাচলেও।
শেখ মো. আমান উল্লাহ্ ২৬ বছর ধরে কর দেন। ই-টিআইএন নম্বর
৩১৩৭৬৬৫৬৪০৬৯ এর (টিন-০৪২-১০৩-৮১০৩) সার্কেল নম্বর ৩২ কল বিশাল এই বিত্ত বৈভবের বিপরীতে ২০১৮ সালে তিনি তার ট্যাক্স রিটার্ন ফাইলে দেখান সম্পদের পরিমাণ ২৫৭৬৪৬৭৫ টাকা কর পরিশোধ করেন ২,৪৩, ৩১৯ টাকা। এফাইলে তিনি উপহার হিসেব স্বর্ণ উল্লেখ করেছেন ২০ ভরি তবে অনুসন্ধানে মিলেছে এই পরিমাণ ৬০০ ভরিরও কাছাকাছি।
তিনি সম্পদ হিসেবে একটি জমিতে সাড়ে ছয়তলা ভবন দেখালেও বাকি সম্পদ দেখিয়েছেন জমি ও টিন শেড স্থাপণা হিসেবে। চাকুরি থেকে অবসরে যাওয়ার পরও এখনো বেতন দেখিয়ে যাচ্ছেন আয়ের উৎস হিসেবে। তার বাৎসরিক বেতন ৩৬৩৮১১.৬১ ও উৎসব ভাতা ৯৭৪৮১ টাকা, পিএফ (প্রোভিডেন্ট ফান্ড) ৩,৮৭,০৫০টাকা, ওভারটাইম ও ফুড এলাউন্স ভাড়া আদায়ের পরিমাণ ১১৬৬২২। শুধু এক স্থানে ২৮ লাখ ১২ হাজার, টিনমত দুই টাকা দেখানো হয়েছে ভাড়া বাবদ অগ্রিম হিসেবে। এমনকি সম্পদ ক্রয়ের যে ফর্দ তিনি দিয়েছেন তাতেও বাজার দর ও সরকারি দরের মাঝে রয়েছে আকাশ পাতাল ফারাক।
আরেকটি অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে হঠাৎ আলাদ্বীনের চেরাগ পাওয়ার আসল রহস্য। তিনি যখন গাজীপুর পোস্টিং হন তখনই খুলে যায় তার কপাল। টঙ্গী, স্টেশন রোড, বোর্ড বাজারসহ গাজীপুরের বিভিন্ন বানিজ্যিক ও আবাসিক এলাকায় মিল ফ্যাক্টরী ও বাসা বাড়িতে মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে অবৈধভাবে গ্যাস লাইন সংযোগ দিয়ে অল্প সময়ের মধ্যে কয়েকশত কোটি টাকার মালিক বনে যান শেখ মোঃ আমান উল্লাহ।
জানা যায়, ঘুষ ও দুর্নীতির দায়ে তাকে একবার ওএসডি করে ছিলেন তিতাস কর্তৃপক্ষ। প্রভাবশালীর বেয়াই হওয়ায় সেখান থেকে রক্ষা পেয়ে যায় আমান উল্লাহ। তাকে স্পর্শ করতে পারিনি কোন সমস্যা-ই।
এসব অভিযোগের বিষয়ে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে শেখ মো: আমান উল্লাহ জানান তার সম্পদ সব অন্যেরা নিয়ে গেছে। জানান এর আগে দুই বার জেল খাটসি। আমার মেয়ে জামাই আমার মেয়েকে তালাক দিসে। সেই মেয়ের জামাই এখন এইসব শয়তানি করতেছে। আমার অবৈধ কিছু নাই। এই রিপোর্ট প্রকাশ হলেও আমার কোন আপত্তি নাই।
Leave a Reply